উখিয়া নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১/০৮/২০২৬ ৬:৩৬ এএম

কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে প্রায় ৩২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই উখিয়া উপজেলার সোনারপাড়া সমুদ্র সৈকত। নিরিবিলি পরিবেশ, সারি সারি ঝাউবন, সাম্পান নৌকা, জেলেদের জীবনযাপন এবং সাগরে মাছ ধরার দৃশ্যের কারণে দিন দিন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে এ সৈকত। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় সৈকতকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে নতুন নতুন রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের দোকান।

তবে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠা সোনারপাড়া সৈকতের সেই সৌন্দর্যই এখন অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে ডাবের খোসায়। সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবনের শেকড় ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে শত শত ডাবের খোসা। কোথাও খোসা অর্ধেক বালির নিচে ঢুকে গেছে, কোথাও আবার ঝাউগাছের শেকড়ে আটকে আছে। ফলে একদিকে যেমন সৈকতের নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

সম্প্রতি সরেজমিনে সোনারপাড়া সমুদ্র সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, মেরিন ড্রাইভ সড়ক থেকে সৈকতের দিকে তাকালেই সারি সারি ঝাউগাছের ফাঁকে ডাব বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়ে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ঝাউবনের পাশে ও বিভিন্ন স্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কাঁচা ডাব। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে চলাচলের সময় ঝাউবনে ঝুলতে থাকা এসব ডাবের দৃশ্য সহজেই নজর কাড়ে। সেই আকর্ষণেই অনেক পর্যটক গাড়ি থামিয়ে সৈকতে নামেন, ডাব খান এবং কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন।

কিন্তু ডাবের শাঁস ও পানি শেষ হওয়ার পর খোসাগুলোর বড় অংশের ঠাঁই হচ্ছে সৈকত ও ঝাউবনের আশপাশে। ফলে যেখানে থাকা কথা ছিল বালুর স্বাভাবিক সৌন্দর্য, সেখানে দেখা যাচ্ছে স্তূপ স্তূপ ডাবের খোসা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোনারপাড়া সৈকতে বর্তমানে প্রায় ১২ জন ব্যবসায়ী ডাব বিক্রি করেন। তারা ঝাউবনের বিভিন্ন স্থানে ডাব সাজিয়ে রেখে পর্যটকদের আকৃষ্ট করেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক এসব দোকান থেকে ডাব কিনে পান করলেও ব্যবহৃত খোসা সংরক্ষণ ও অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা খোসাগুলো নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখেন। পরে সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও পানির স্রোতে অনেক খোসা সৈকতের দিকে নেমে এসেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু একটি-দুটি জায়গায় নয়, সৈকতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে রয়েছে ডাবের খোসা। অনেক খোসা বালিয়াড়ির মধ্যে ঢুকে গেছে। আবার ঝাউগাছের শেকড়ের পাশে জমে থাকা খোসাগুলো দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকার কারণে সেগুলো পচতে শুরু করেছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি সৈকতের পরিবেশও নোংরা হয়ে উঠছে।

ডাব বিক্রেতা মহি উদ্দিন বলেন, ‘আমি এখানে প্রায় সাত বছর ধরে ব্যবসা করছি। ডাবের খোসাগুলো আমরা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখি। পরে সেগুলো বিক্রি করে দিই। এখন বর্ষার বৃষ্টির কারণে অনেক খোসা সমুদ্র সৈকতের দিকে নেমে গেছে।’

আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জমির বলেন, ‘খোসাগুলো সৈকতে পড়ে থাকার কারণে সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে, এটা আমরা স্বীকার করছি। এটার জন্য আমাদেরও সচেতন হতে হবে। অনেক সময় পর্যটকরাও ডাবের খোসাসহ বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে দেন। তবে ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে।’

ব্যবসায়ী মায়মুন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা পরবর্তী সময়ে সৈকত পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করব। এখন অনেক খোসা হয়ে গেছে। এগুলো একসঙ্গে সরানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ডাবের খোসা পড়ে থাকলেও কার্যকরভাবে তা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। পর্যটন সম্ভাবনাময় এই সৈকতে প্রতিদিন নতুন নতুন পর্যটক আসছেন। কিন্তু সৈকতের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা ডাবের খোসা ও অন্যান্য বর্জ্য দেখে অনেকেই বিরক্ত হচ্ছেন।

সোনারপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক মাহাবুব কাউসার বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে ডাবের খোসাগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমরা সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও এখানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সৈকত পরিষ্কার রাখার জন্য বলেছি। তাদের নিজেদের মধ্যে টাকা তুলে সবাই মিলে জায়গাটি পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সেটি করেনি। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য ডাব বিক্রি হবে, ব্যবসা হবে এতে আপত্তি নেই। কিন্তু ব্যবসার কারণে সৈকতের পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রশাসনেরও নিয়মিত নজরদারি দরকার।’

স্থানীয়দের মতে, সোনারপাড়া সৈকতের সৌন্দর্যের অন্যতম বড় আকর্ষণ এর ঝাউবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে হওয়ায় অনেক পর্যটক নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করতে এখানে আসেন। কিন্তু ঝাউবনের শেকড়ে ও বালিয়াড়িতে ডাবের খোসা জমে থাকলে ধীরে ধীরে সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে।

শুধু ডাবের খোসা নয়, সৈকতে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে সোনারপাড়া সৈকতের পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে সৈকত এলাকা পরিচ্ছন্ন করা হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হবে এবং সচেতনতা বাড়ানো হবে। তাদের ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই ডাস্টবিন ব্যবহার করতে হবে। ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে হবে এবং ব্যবসা শেষে সৈকত এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’

ট্যুর অপারেটরস এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, সোনারপাড়া সৈকতকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ডাব বিক্রির মতো স্থানীয় ব্যবসা যেমন পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে, তেমনি এসব ব্যবসা থেকে তৈরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও ব্যবসায়ীদের নিতে হবে।

তাদের মতে, প্রতিটি ডাব বিক্রির দোকানের পাশে ডাস্টবিন স্থাপন, নির্দিষ্ট স্থানে ডাবের খোসা সংরক্ষণ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং প্রশাসনের নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে খুব সহজেই এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে পর্যটকদেরও যেখানে-সেখানে ডাবের খোসা ও অন্যান্য বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

সোনারপাড়া সৈকতে পর্যটকের আনাগোনা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধিও। তাই শুরুতেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা না গেলে ভবিষ্যতে পর্যটন সম্ভাবনাময় এই সৈকতই হয়ে উঠতে পারে পরিবেশ দূষণের নতুন উদাহরণ। আর এখনই ডাবের খোসার স্তূপ সরিয়ে সৈকতকে পরিচ্ছন্ন রাখা গেলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখার পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও সোনারপাড়ার আকর্ষণ আরও বাড়বে। সুত্র,বার্তা২৪

পাঠকের মতামত

সীমান্ত নিরাপত্তায় পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি হচ্ছে রামু সেনানিবাস

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা ...

বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়দৈনিক আজকের কক্সবাজার বার্তা গণমানুষের কন্ঠস্বর হয়েই থাকবে

নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজার জেলার বহুল প্রচারিত দৈনিক আজকের কক্সবাজার বার্তার প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার ...
Single Page Footer